সোমবার , ১২ এপ্রিল ২০২১ | ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
  1. অনুষ্ঠান
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. করোনা সচেতনতা
  6. করোনাভাইরাস
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চাকরীর খবর
  10. জাতীয়
  11. টিভি Live
  12. তথ্যপ্রযুক্তি
  13. দেশ জুড়ে
  14. ধর্ম
  15. নারী-ও-শিশু

রঙ-সুতার দামের সাথে তাঁতিদের ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে করোনা

প্রতিবেদক
ltvofficial
এপ্রিল ১২, ২০২১ ২:১২ অপরাহ্ণ

‘সারাবছর ব্যবসা করে রমজান মাসে আমাদের ঘাটতি পূরণ করি। কিন্তু এবার রমজানের আগে সুতা ও রঙের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় লাভের মুখ আর দেখব না। এর উপর মহাজনের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছি তা আর পরিশোধ করার অবস্থা নেই। রমজান মাসে আমরা ব্যবসা তো করতেই পারব না উল্টো বেশি দামে সুতা কিনে কম দামে কাপড় বেচতে হবে।’

কথাগুলো বলছিলেন পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার শিবপুর গ্রামের শামসুর রহমান।

তাঁত বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন তারা পুরো বিষয়টি জানেন, তবে রঙ ও সুতার দাম কমানো কিংবা বাড়ানো সরকারের নীতি নির্ধারণী ব্যাপার।

প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার পাবনার আতাইকুলায় শতবর্ষী ঐতিহ্যের লুঙ্গি-শাড়ির হাট বসে। আতাইকুলা হাটে গেলে তাঁতি, রঙ ও সুতার ব্যবসায়ী, শ্রমিকরা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।

সাঁথিয়া উপজেলার বিলসলঙ্গী গ্রামের শাহাব উদ্দিন মুন্সী বলেন, ‘১৮শ টাকা বান্ডিলের সুতার দাম এখন ২৪শ টাকা, এক হাজার টাকার রঙের দাম এখন তিন হাজার টাকা। আমার লাভ করে প্যাটে (পেটে) দিবের পারতিছিনে। বাড়ি-গর বেচি দিলিও দিনা শোদ অবিনানে। আমলীগ সরকার, তাঁতির সরকার। কার্যকলাপে তা পাইলেম না। আমরা দরিদ্র ও পতন অয়া গেচি।’

jagonews24

সুজানগর উপজেলার আমিনপুর থানার চর গোবিন্দপুর গ্রামের সোহরাব আলী বলেন, ‘কী কব দুঃখির কথা। আমার ৪টি তাঁত। রঙ-সুতার দাম বাড়ার কারেণ আজ আমি ছোলা-বড়া বেচে খাই।’

তাঁত বোর্ডের পাবনার সাঁথিয়ায় অবস্থিত বেসিক সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, পাবনায় প্রায় আড়াই লাখ তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র এক তৃতীয়াংশ। তাঁতি ভেদে ১-২টি থেকে শুরু ৫০টি তাঁতও রয়েছে। জালালপুর নতুনপাড়া ছাড়াও সদর উপজেলার দোগাছি, ভাড়ারা, গঙ্গারামপুর, বলরামপুর, মালঞ্চি, কুলুনিয়া, খন্দকারপাড়া, কারিগরপাড়া, সাঁথিয়া উপজেলার ছোন্দহ, ছেচানিয়া, জোড়গাছা, সোনতলা, কাশীনাথপুর, পাটগাড়ি, বেড়া উপজেলার কৈটলাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁত পল্লী রয়েছে। এসব তাঁতশিল্পে প্রায় দেড় লাখ পুরুষ ও নারী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ জনবল এ শিল্পের সাথে জড়িত।

সাঁথিয়ার কাশিনাথপুর তাঁত পল্লীর তাঁত মালিক মামুনুর রশিদ জানান, গত দেড় দশক ধরে তাঁতি সম্প্রদায় টানাপোড়েনের মধ্যে চলছে। ২০০৪ সালের বন্যায় সাঁথিয়া-বেড়ার প্রায় আট হাজার তাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাঁত বুননরত কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় তাঁতিরা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। ধার-দেনা করে তাঁত মালিকেরা ব্যবসা টিকিয়ে রাখেন।
ওদিকে ভারতীয় নিম্নমানের ও কমদামি কাপড়ের অবাধ অনুপ্রবেশে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়ে তাদের ব্যবসায় বিগত বছরগুলোতে মন্দা চলছে। ক্রমবর্ধমান লোকসান কাটিয়ে ওঠাতো দূরের কথা এবার সুতা ও রঙের দাম বৃদ্ধির সাথে করোনার কারণে তাদের ব্যবসা মন্দা থেকে মহামন্দার কবলে পড়েছে।

কেন এই মহামন্দা? এমন প্রশ্নের জবাবে সাঁথিয়ার কাশিনাথপুরের তাঁত পল্লীর মালিক-শ্রমিকরা জানান, গত ৬ মাসে সুতার দাম বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। পঞ্চাশ কাউন্টের সুতার দাম ছিল ১৩ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। ঠিক একইভাবে দাম বেড়েছে ৬০ কাউন্ট, ৭০ কাউন্ট, ৭২ কাউন্ট বা ৮০ কাউন্টের সুতার।

তারা জানান, স্বাভাবিকভাবেই লুঙ্গি ও শাড়ির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু সে অনুপাতে দাম বাড়ানো যায়নি। তাঁতিরা বলছেন এতে তারা উভয় সংকটে পড়েছেন। একদিকে দাম বেড়ে যাওয়ায় বেচা-কেনা কমে গেছে, ফলে লোকজন লুঙ্গি, শাড়ি কম কিনছে। অন্যদিকে সুতার দাম যে পরিমাণে বেড়েছে সে অনুপাতে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ানো যায়নি। ফলে লভ্যাংশ থাকছে না আর থাকলেও তা এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসার চালানোর মতো যথেষ্ট নয়। করোনা সংকটের কারণে তাদের ব্যবসায় আরো সংকট দেখা দিয়েছে।

jagonews24

কাশীনাথপুরের তাঁতিরা জানান, এ মহল্লায় আটশ পরিবারে প্রায় এক হাজার তাঁত রয়েছে। তার মধ্যে এখন শ’খানেক চালু রয়েছে। অভাবের তাড়নায় অনেকে কমদামে তাঁত বিক্রি করে দিচ্ছে। রমজান মাস শেষ হলে তাঁতের সংখ্যা আরও কমে যাবে বলে তারা জানান।

মাজেদা খাতুনের(৫৫) মতো অনেকেই আবার মরণ কামড় দিয়ে পৈত্রিক পেশা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। কিন্তু সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভের মুখ দেখা দায়।

বয়োবৃদ্ধ তাঁতিরা জানান, তাঁত শিল্পে এমন বিপর্যয় তারা গত ৪০ বছরেও দেখেননি। একই চিত্র সাঁথিয়া পৌর এলাকার তাঁত পল্লীতেও। পৌরসভার মধ্যে সাড়ে চার হাজার তাঁতের মধ্যে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ তাঁতই বন্ধ। ফলে পৌর এলাকাতেই প্রায় ১০ হাজার তাঁতি বেকার হয়ে পড়েছে আর গোটা সাঁথিয়ায় লক্ষাধিক লোক বেকার হয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছে।

তাঁতি পরিবারের খালেদ মাহমুদ চঞ্চল জানান, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে শ্রমিকরা বছরের পর বছর ধুঁকছে। কিন্তু সরকার বিষয়টির প্রতি নজরই দেয় না।

তিনি বলেন, ছোট তাঁতিরা একটি-দুটি তাঁত চালান। কিন্তু তাদের বৈদ্যুতিক বিল করা বাণিজ্যিকহারে। তারা বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার সময়ও শিল্প মর্যাদায় তা পান না। প্রচুর টাকা জামানত দিয়ে মিটার আনতে হয়।
তিনি বলেন, তাঁতিদের বিদ্যুৎ বিল চাষিদের সেচযন্ত্রের মতো কম রেটে করা দরকার।

jagonews24

দেশের অন্যতম বিখ্যাত কাপড়ের হাট আতাইকুলা হাটে বসে পাবনা সদর উপজেলার জাফরাবাদের আ. আজিজ সুতার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানান।

তিনি জানান, ২/১ জন ব্যবসায়ী মিলে সুতা কিনে নিয়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ান। আমরা তাদের হাতে বন্দি।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জালালপুর নতুনপাড়া গ্রামের তাঁত শ্রমিক বেলাল হোসেন ও আ. কুদ্দুস জানান, একটা লুঙ্গি তৈরি করতে তারা মজুরী পান ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন তারা অন্তত ১৫-২০টি লুঙ্গি তৈরি করতে পারেন। আর শাড়ি তৈরি করতে মজুরি পান ১২০-২৫০ টাকা। সপ্তাহে ৮-১০টি শাড়ি তৈরি করা যায়। এবার রঙ-সুতার দাম বৃদ্ধি এর ওপর করোনার প্রভাবে বাজারে চাহিদা কম, তাই মালিকের কাজের তাড়া নেই। এতে শ্রমিকরাও ক্ষতির মুখে বলে তারা জানান।

শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে জালালপুর নতুনপাড়া গ্রামের অন্যতম তাঁত মালিক আকবর আলী জানান, জামদানি, সুতি জামদানী, সুতি কাতান, চোষা, বেনারশি, শেট নামে নানা নাম ও ডিজাইনের শাড়ি তৈরি হয় তাদের তাঁত পল্লীতে। এ ছাড়া বিভিন্ন নবাবী নামের লুঙ্গিও তৈরি হয়।

অপর তাঁত মালিক আব্দুল করিম জানান, ঈদের সামনে তাদের বেচাকেনা ভালো হয়। কিন্তু এবার রঙ ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা লাভের মুখ দেখবেন কিনা সন্দেহ।

তিনি জানান, গতবারের মতো এবারও করোনা রোগ থাকায় কাপড়ের ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

দেশের খ্যাতিমান তাঁতি ও পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার চাঁচকিয়ার আব্দুর রহিম লুঙ্গি প্রতিষ্ঠানের মালিক বারিকুল ইসলাম জানান, তাদের লুঙ্গি দেশে ও দেশের বাইরে যায়। রঙ ও সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও ক্ষতির মুখে।

jagonews24

তিনি জানান, রমজানে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়। কিন্তু এবার সুতা ও রঙের দাম বৃদ্ধি এবং করোনা সংকটে ব্যবসা ক্ষতির মুখে। ইতোমধ্যে তারাও অনেক তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিলে তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা বাঁচবেন বলে তিনি জানান।

পাবনা জেলা তাঁতি লীগের সদস্য সচিব সোহরাওয়ার্দী জানান, রঙ ও সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে তাঁতিরা এমনিতেই চরম ক্ষতিগ্রস্ত। এর উপর করোনা সংকট তাদের জীবনে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাবনার তাঁত বোর্ড অফিসের সুপারভাইজার এবং ভারপ্রাপ্ত লিয়াজো অফিসার জানান, তারা তাঁতিদের উপর সার্ভে করেছেন। তাঁতিদের নানা অভাব অভিযোগের কথা তাঁত বোর্ডকে জানিয়েছেন।

তাঁত বোর্ডের সভাপতি মো. শাহ আলম ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, তাঁতিদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। কিভাবে তাঁতি সম্প্রদায়কে সহযোগিতা করা যায় সে ব্যাপারে তিনি মন্ত্রণালয়ে জানাবেন।

সর্বশেষ - বিনোদন