• English
  • আজ ১৯শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সংস্কৃতির অন্যতম রোডম্যাপ নিজের ভাষাকে গুরুত্ব দেয়া

৮:১৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১ প্রবাস

যদি কোনো মানুষের সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলেন যা সে বোঝে, তবে তা তার মাথায় থাকে। যদি তার সঙ্গে তার নিজের ভাষায় কথা বলেন তবে তা তার হৃদয়ে যায়। কথাটি নেলসন ম্যান্ডেলার। ম্যান্ডেলার এই ভাষ্যটি হৃদয়খচিত।

যখন কোনো বিশ্বনেতা কোনো দেশে যাই, তারা বক্তব্যের শুরুতে সে দেশের ভাষায় অভিবাদন জানায়। এরপরে নিজেদের ভাষায় বক্তব্য দেন। কোরিয়ায় থাকা অবস্থায় দেখেছি একটি জাতি কি করে নিজের ভাষা সংস্কৃতি দিয়ে বিশ্বদরবারে আসন করে নিয়েছে।

আমি কোরিয়ার প্রবাসজীবনে কোনোদিন দেখিনি কোনো কোরিয়ানকে গর্ব করে ইংরেজি বলতে, তারা ইংরেজি জানলেও ইংরেজি বলতে চাই না। কোরিয়ানরা তাদের ভাষাকে বিশ্ববাসীর সঙ্গে একটি করিডোর স্থাপনের যোগসূত্র করেছে, শুধু কি তাই তাদের ভিনদেশের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক গবেষণা কর্মগুলোকেও ইংরেজীতে প্রকাশের আগে কোরিয়ান ভাষায় প্রকাশ করে।

একইভাবে বলতে পারি জার্মানির কথা, ইউরোপের অন্যতম অর্থনীতির দেশ জার্মানি তারাও তাদের ডয়েসেকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি করেছে, অধিকাংশ জার্মানরা সহজে ইংরেজী বলতে চান না। জার্মানিতে এসে স্বচক্ষে দেখছি।

জার্মান বলুন, কোরিয়ান বলুন তারা বুঝেছে, সংস্কৃতির অন্যতম রোড ম্যাপ হলো নিজের ভাষাকে গুরুত্ব দেয়া। মায়ে ব্রাউনের মতে, ভাষা এটি আপনাকে জানায় যে এর লোকেরা, কোথা থেকে এসেছে এবং তারা কোথায় যাচ্ছে। যেটি বলতে চাই, আপনারা জানেন আফ্রিকার একটি দেশ সিয়েরালিওন।

সেখানকার রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা। এর পেছনে অন্যতম কারণ সেখানে শান্তির দূত হয়ে কাজ করেছিলেন, বাংলাদেশের গর্বিত সেনাবাহিনী। আফ্রিকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার কারণে সে দেশের সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

বাংলাদেশের পর অন্যকোনো রাষ্ট্রে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায়। সূত্রমতে, সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষা প্রচার, প্রসার কিংবা সংস্কৃতির আদান প্রদানে সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু আজও সিয়েরা লিওনের মানুষদের মুখে শোনা যায় বাংলা ভাষা।

সিয়েরা লিওনের মানুষেরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানকে। কিছুদিন আগে একটি তথ্যচিত্র দেখছিলাম সাংবাদিক মনজুরুল করিমের; কি করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা বিকাশ হচ্ছে তার বর্ণনা।

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সম্পূর্ণ পৃথক সংস্কৃতির দেশগুলোতে বাংলায় কথা বলে ভিনদেশি নাগরিকরা। বড় বেদনার বিষয় হচ্ছে, বাংলাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ দরকার তা কি আমরা নিতে পেরেছি। নিদেনপক্ষে আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাভাষার কেন্দ্র খুলতে পারতাম।

ভিনদেশের নাগরিকরা যাতে বাংলাভাষা শিখতে পারে তার জন্য ভালো কোনো অ্যাপ নেই, প্রতিষ্ঠান নেই, ইউটিউবে ভালো টিউটোরিয়াল নেই, ভালো কোনো কোর্স নেই। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। মা, মাতৃভাষা ও দেশপ্রেম জিনিসটা আসলে কী বিদেশ না এলে বোঝা মুশকিল।

ভিনদেশের হোক, স্বদেশের হোক কাউকে যখন দেখি বাংলায় কথা বলছে, তখন তার সঙ্গে স্ব-উদ্যোগে পরিচয় হই। অনেক কোরিয়ানকে দেখিছি বাংলায় কথা বলতে বিদেশের মাটিতে পথ চলতে কারও মুখে বাংলা শব্দ শুনলে তাকে আপন মনে হয়।

বাংলা সাইনবোর্ড লেখা দোকান দেখলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাই। বাংলাভাষী কারো দোকান দেখলে সেখানে বসে আড্ডা দিই। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রবাসে বাঙালির সংখ্যা বেড়েছে। সে হিসেবে অনেক বাংলাদেশিরা দোকান, রেস্তোরাঁ দিয়েছে, সেখানে একে অপরের সাথে বাংলায় কথা বলে শান্তি খুঁজে ফিরে।

পহেলা বৈশাখ, বইমেলা, বাংলা কবিতার আসর, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো হরেক রকমের আয়োজন। এখন প্রবাসেও বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল বের হয়, অনেক বছর ধরে আমেরিকা, লন্ডনে বাংলা পত্রিকা বেরোয়।

বাংলা টিভি রেডিওও চালু হয়েছে। বিভিন্ন দেশে বাৎসরিক বাংলা ম্যাগাজিন বের হয়। বাঙালিরা শিল্প–সাহিত্য–সংগীতের চর্চা করে প্রবাসে। বাঙালি পরিবারগুলো সন্তানদের প্রাণপণভাবে বাংলা শেখাচ্ছে।

বাংলা ভাষার জন্য প্রবাসীরা যে ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্জন একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ বিষয়ে কানাডাপ্রবাসী বাঙালি আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলামের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

তারা তাদের সংগঠন কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রথমে ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘে এবং পরে ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

পরে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্রিয় সহযোগিতা ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি নিয়মানুগভাবে ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর সেই সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। এখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনের সামনে শহীদ মিনার বানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মিনার হয়েছে, সম্প্রতি ফ্রান্সের তুলুজ শহরে প্রবাসীদের প্রচেষ্টায় স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ হয়েছে, স্থায়ী শহীদ মিনার রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়, বিশ্বের নানান জায়গায় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাংলা স্কুল গড়ে ওঠেছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাসটি আমাদের বাংলাদেশের। পৃথিবীর বুকে আমরা একমাত্র জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি।লৌকিকতাপূর্ণ অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে বুদ্ধিভিত্তিক উদ্যোগ আসুন এটিই হোক আমাদের শপথ।