• English
  • আজ ১লা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

সব লোকসানি কারখানা-প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে সরকার

৩:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০২০ জাতীয়

রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বেশ কিছু চিনিকলও বন্ধ করা হয়েছে, আরও কিছু চিনিকল বন্ধের পরিকল্পনায় রয়েছে। পাট ও চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসান দিয়ে আসায় সরকার এসব বন্ধ করে দিয়েছে, দিচ্ছে। কেবল এই পাট ও চিনিকলগুলোই নয়, লোকসানি সব ধরনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেবে সরকার এবং সেখানে বেসরকারি খাতকে সুযোগ করে দেবে।

অবশ্য সরকার লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখবে। সেই সঙ্গে অস্ত্র কারখানার মতো যেসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেয়া যাবে না কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আসতে পারবে না, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে সরকার। এমন পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সরকার। সেই আলোকেই করা হচ্ছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। সেজন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৮১ শতাংশ এবং সরকারি খাতের বিনিয়োগ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম জানিয়েছেন এ তথ্য। সম্প্রতি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্রে (সিরডাপ) লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ আয়োজিত ‘ডেভেলপমেন্ট প্লানিং এক্সপেরিয়েন্সেস ইন বাংলাদেশ (ফলোয়িং অ্যা প্ল্যানড পাথ অব গ্রোথ উইথ অ্যা ভিশন)’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি জানান, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখে দেয়ার পরই তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি তৈরি করছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি কলকারখানা বন্ধ করা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা। কারণ এই লোকসান শ্রমিকদের কারণে হয় না; হয় মূলত প্রশাসনের লুটপাট, দুর্নীতির কারণে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে এর ফল ভোগ করতে হবে শ্রমিকদের, তারা কর্মহীন হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে পাবলিক সেক্টরে যে ন্যূনতম মজুরির জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটাও আর কার্যকর থাকবে না। তাই এটা স্পষ্টতই গণবিরোধী নীতি।

লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে সেই সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিচ্ছে, আমি মনে করি না। লাভজনক হলে সরকার চালাতে পারবে। যদিও বেসরকারি খাতে গেলে আরও বেশি লাভ হতে পারতো। তবু লাভজনক হলে সরকার থাকবে। এটা হলো আমাদের নীতি। কিন্তু যেগুলোতে ঘাটতি দিচ্ছে বছরের পর বছর, সেগুলোকে ছেড়ে দেবে সরকার। এটা প্রকাশ্যভাবেই আমরা প্ল্যানে (অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) বলেছি। লস ট্রেকিংগুলোকে (লোকসানি কলকারখানা) জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে চালিয়ে রাখা যায় না।’

‘দিস ডকুমেন্ট (অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা) ইজ বেসিক্যালি অ্যা পলিটিক্যাল ডকুমেন্ট (এটি একটি রাজনৈতিক নথি)। এটা রাজনৈতিক সরকার ডকুমেন্ট তৈরি করছে। এটা শামসুল আলমের ডকুমেন্ট না’, বলেন তিনি।

শামসুল আলম বলেন, ‘তারপরও রাষ্ট্র সেসব শিল্প-কারখানা চালু রাখবে, যেগুলো ব্যক্তিখাতে আসতে পারে না বা আসবে না। যেমন একসময় এ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন রাষ্ট্রই করতো, কারণ এত বড় বিনিয়োগে বেসরকারি খাত আসতো না। এখন বেসরকারি খাত আসে। শিক্ষা ছিল জনপণ্য। তো শিক্ষা এখন বেসরকারি খাতে আসছে। বেসরকারি খাত যেটা পারে, তারা সেটা অবশ্যই করবে। শিল্প-কারখানা সরকার সেটুকুই করবে, যেমন অস্ত্র কারখানা। এটা রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে। কারণ অস্ত্র বেসরকারি খাতে গেলে কখন অস্ত্র কার হাতে চলে যায়।’

দেশ আগের মতো মুক্ত অর্থনীতির দিকে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অষ্টম পঞ্চবার্ষিক শেষের পর্যায়ে আছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মুক্ত অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলাম, এবার আরও বেশি। এবার ৮১ শতাংশ আসবে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। ৭৭ শতাংশ বিনিয়োগ বলেছিলাম সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তার মানে ধীরে ধীরে আমরা বিশ্ব অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি আরও রফতানিতে।’

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতকে মূল ড্রাইভিং সিটে রাখা হবে মন্তব্য করে শামসুল আলম বলেন, ‘বেসরকারি খাত ৮১ শতাংশ ব্যয় করবে, সরকারের ১৯ শতাংশেরও গুরুত্ব অনেক। কারণ সে সুশাসন দেবে, বিনিয়োগ করার স্বাধীনতা থাকবে, সেটার সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব–সেই কাজ সরকার করবে। আমি বাংলো কিনলে সেটা কেউ দখল করে নিয়ে যাবে না, আমি সম্পত্তি অর্জন করলে সেটা কেউ নিয়ে যাবে না–এটা রাষ্ট্রকে নিশ্চয়তা দেবে। অবকাঠামোতে যেখানে বেসরকারি খাত আসবে না, সেটা সরকার করে দেবে–এ রকম। এজন্য অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হবে আরও বাজারমুখী।’

ক্রমাগত ঘাটতিতে থাকা পাট ও চিনিগুলো চালু রাখার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের এ সদস্য।

তিনি বলেন, ‘আজকে পাটকল সরকার চালায়, বাধ্য হয়ে চালায়। কিন্তু পাটকলে একজন শ্রমিকের বেতন হলো ৯০০ টাকা। আর রংপুর গিয়ে দেখেন, একজন পাটকল শ্রমিকের বেতন সাড়ে ৪০০ টাকা। কেমনে সরকার এটা পারবে?’

আরও উদাহরণ টেনে শামসুল আলম বলেন, ‘শিপিং সরকার চালাবে কি-না? ২৯টি শিপ থেকে এখন আমরা ৮টায় নেমেছি। তারপরও ৩টা কিনতে দিয়েছি ৫ মাস আগে। কয়েক বছর পরে তারা বলবে আরও দুইটা দেন, তাহলে আমরা ব্যবসা করতে পারবো। তো এই ব্যবসা হলো জনগণের টাকার অপচয়।’

তিনি বলেন, ‘সিমেন্ট রাষ্ট্রখাতে ছিল। এখন সিমেন্ট রফতানি করা যায়। এখন সরকারের দরকার কী সিমেন্ট কারখানা চালানোর?’

বিমানের বিষয়ে ব্যক্তিগত মত তুলে ধরে শামসুল আলম বলেন, ‘বিমান চালানোর কোনো অর্থ আছে? ইতালিয়ান এয়ারলাইন্স আলিতালিয়া আছে এখন? যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটা নামকরা এয়ারলাইন্স ছিল, সেটাও এখন আর নেই। তো সরকারের অবশ্যই রাখা উচিত নয়, যেটা ঘাটতি যাচ্ছে। কারণ এতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা নষ্ট হয়। সরকার সেটা রাখবে, যেটা সফলভাবে চলছে। সেটা রাখতে অসুবিধা নেই।’

সরকারের লোকসানি কারখানা বন্ধের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি তো মনে করি, এটা ঠিক লাইনেই আছে। সরকার ব্যবসা করতে গেলে সেখানে ভেসে যায়, বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি অপচয়–এগুলো হয়ে থাকে। এটা যুগ যুগ ধরেই হচ্ছে। আবার অদক্ষতা আছে। আর একবার চাকরিতে ঢুকলাম, আর কখনো চাকরি যাবে না–কাজ করি বা না করি, এগুলো আমরা তো দেখছি।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং বেসরকারি খাতকেই এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে সরকারের ভর্তুকি বা চ্যারিটি করার সুযোগ নেই। বরং সেই অর্থ জনগণের কল্যাণের জন্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করুক, আরও স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল–এগুলো বানাক। সেটাই করা উচিত। আর ব্যক্তিখাতের ওপর ছেড়ে দিক। ব্যক্তিখাত যেন ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারে, সেই নীতিমালা সহজ করে তাদের উৎসাহিত করা উচিত।’

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট ও চিনিকল বন্ধের প্রতিবাদে নিয়মিত সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন করে থাকে বাম রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো। তারা রাষ্ট্রায়ত্ত অলাভজনক বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোর বিরোধী।

এ বিষয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারি খাতের বিভিন্ন কলকারখানা লোকসানে রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করে দেবে–সরকারের এমন সিদ্ধান্ত জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। এই লোকসানটা হয় মূলত মাথাভারী প্রশাসন, লুটপাট, দুর্নীতির কারণে। সেক্ষেত্রে লোকসানি খাত যদি বন্ধ করতে হয়, সবার আগে বন্ধ করা দরকার খোদ সরকারকে। সরকারকে বন্ধ করে দিলে লোকসানি খাতটা বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ সরকার নিজেই সবচেয়ে বড় লোকসানি খাত। সরকার কিন্তু মাথাভারী প্রশাসন ও দুর্নীতি-এগুলো বন্ধ করছে না। তারা প্রশাসনে মোটামাথার অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে রেখেছে, বিশেষত উচ্চ পদগুলোতে, সেখানে বিপুল ব্যয় করে জনগণের মাথাপিছু ব্যয় বাড়িয়ে ফেলেছে। জনগণের টাকা দিয়ে সরকার এ ধরনের একটা মাথাভারী প্রশাসন লালন-পালন করছে। তারা অবাধে দুর্নীতি, লুটপাত করছে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ না করে পাবলিক সেক্টরের যেসব কলকারখানা রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করার দিকে যাচ্ছে। ফলে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থানের সঙ্কট সৃষ্টি হবে।’

‘দেশে পাবলিক সেক্টরে মজুরির ন্যূনতম যে জায়গা তৈরি হয়েছিল, সেটা যেন আর কার্যকর না থাকে, সেটার জন্য তারা কাজ করছে। ফলে এটা স্পষ্টতই একটা গণবিরোধী নীতি’, মন্তব্য করেন জোনায়েদ সাকি।

বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধই ‘যথেষ্ট নয়’
বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন মনে করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কেবল লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধই যথেষ্ট নয়।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য গত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ওরকম ছিল। সেরকম বিনিয়োগ তো আসেনি। বিনিয়োগ যে কারণে আসেনি, সেই বাধাগুলোকে যদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দূর করার জন্য কার্যক্রম না নেয়া হয়, তাহলে তো একই ফলাফল পাওয়া যাবে। শুধু অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতের জন্য খুলে দেয়া, সেটা যথেষ্ট হবে না। কারণ বেসরকারি খাতকে কীভাবে খুলে দিচ্ছেন, সেটার ওপর নির্ভর করবে ওরা ওটাতে আগ্রহী হবে কি-না। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান আর কয়টা আছে? ৮১ শতাংশ বিনিয়োগ আনার জন্য তো ওখানে আগ্রহ থাকলেও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেগুলো শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান আছে, সেবা-বাণিজ্য খাতের প্রতিষ্ঠান আছে–এগুলোর বাইরের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আনা যাবে না। যেমন বিআইডব্লিউটিএ, বিটিআরসি–এগুলোও তো সরকারি প্রতিষ্ঠান। এগুলো নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, এখানে তো আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনা সম্ভব না। বড় কথা হলো সার্বিকভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জমির সমস্যা, ইউটিলিটিগুলো বাড়ানোর সমস্যা, দক্ষ শ্রমিকের সমস্যা, আইন-কানুনের জটিলতার সমস্যা–এগুলোর কারণেই তো বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এগুলোকে আংশিক নয়, পুরোপুরিভাবে সংস্কার করতে না পারলে হবে না।’

জাহিদ হোসেন বলেন, একটা অর্থনৈতিক অঞ্চল শেষ করতে না পারলে লক্ষ্য থাকলেই তো আর বিনিয়োগ হবে না। তারপর ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) বলছি আমরা করবো, কিন্তু ওই সেবা না পাওয়া পর্যন্ত যতই কাজ করা হোক না কেন, বিনিয়োগকারীদের কাছে সুফল যাচ্ছে না। আরও অন্যান্য যে বাধাগুলো আছে, বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো, সড়কের চলাচল যোগ্যতা বাড়ানো–এগুলো তো বেসরকারিখাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা। এসব জায়গায় অবস্থার পরিবর্তন না করতে পারলে ওই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার মনে করেন জোনায়েদ সাকিও। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ দরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে দুর্নীতি কমানো, অবকাঠামো, নীতি, ব্যাংকিং সুবিধা নানাসহ সুযোগ-সুবিধা দরকার। এসব জায়গা এখনো বিপজ্জনকভাবে বিনিয়োগবান্ধব হওয়ার বদলে বিনিয়োগপ্রতিবন্ধক হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারির ক্ষেত্রে ভীষণরকম বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা আছে। যার কারণে এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারে বিনিয়োগ ও শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। ফলে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের যে অসামঞ্জস্যতা সেটাই বলে দেয়। সরকার এখানেও তার ক্রমাগত ব্যর্থতা দেখিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার তার যে প্রবৃদ্ধির কথা বলে যায় উন্নয়নের নামে, উন্নয়ন তো একটা গালভরা কথা। সরকার একটা প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, এখানে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি মানেই তো উন্নয়ন নয়। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যদি সামঞ্জস্যভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে কিন্তু উন্নতি যে হচ্ছে সেটা দাবি করা যাবে। বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ অসমঞ্জস্যপূর্ণ। এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে না।’

বৈষম্য রোধে সরকারের নীতি অকার্যকরের শঙ্কা
আয়-বৈষম্যের বিষয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য শামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের বড় উদ্বেগ হলো আয়-বৈষম্য যেন না বাড়ে। তবে আয়-বৈষম্য বাড়ে উন্নয়নের একটা পর্যায়ে। কেন বাড়ে? উচ্চবিত্ত যত অবদান রাখে ব্যবসা-বাণিজ্যে, যত যোগ করে অর্থনীতিতে, যারা গরিব আছি তারা কি সেই পরিমাণ যোগ করছে? যেহেতু যোগ করে না, যারা উৎপাদন করছে তাদের ভাগে এখন বেশি যাবে। আমরা যেটা চেষ্টা করছি, এই বৈষম্য যেন না বাড়ে, ধনী শ্রেণির কাছ থেকে ট্যাক্সের মাধ্যমে টাকা-পয়সা নিয়ে ফ্রি শিক্ষা করে দরিদ্রদের সুযোগ দেয়া। স্বাস্থ্যে খরচ করে মানবসম্পদ তৈরি করা। গ্রাম-গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো তৈরি করে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা। এইভাবে আয়-বৈষম্য কমিয়ে আনার সুস্পষ্ট নীতি আমরা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রহণ করেছি। বিধবা ভাতা, দরিদ্র ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা–এরকম ১২৫টি ভাতা আছে। এগুলোর লক্ষ্য হলো আয়-বৈষম্য কমিয়ে রাখা।’

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ মনে করেন, কেবল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়-বৈষম্য রোধ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘আয় বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি তো অবশ্যই আছে। সেজন্য এই প্রক্রিয়ার (৮১ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ) সঙ্গে যেন সবাই সম্পৃক্ত হতে পারে এবং বিনিয়োগের সুযোগগুলো যেন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত না থাকে। ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ যেগুলো আছে, সেগুলোকে সম্পৃক্ত করা না গেলে বৈষম্য বাড়ার যে ঝুঁকি, সেটা বাস্তবে পরিণত হবে।’

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বেসরকারি খাত হচ্ছে কৃষি। কৃষির যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ানো যায়, কৃষকের আয় যদি না বাড়ে–তাহলে বৈষম্য তৈরি হবেই। সেজন্য বিনিয়োগগুলো যেন সর্বত্র হয় এবং বিনিয়োগের সুযোগগুলো ছোট-বড় সবাই যেন পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ছোটগুলো যেন ছোট না থেকে বড় হওয়ার সুযোগ পায়, সেজন্য সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে এই শ্রেণিকে সম্পৃক্ত করার যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। তারা কোল্ড স্টোরের অভাব, গ্যারান্টর নেই বা ফরমাল সেক্টরে কোনো রেজিস্ট্রেশন করতে পারে না। সেজন্য তারা আবার আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তও হতে পারে না। ঋণের সুযোগ পায় না। এই শ্রেণিখাত থেকে উন্নয়নের যে বাধাগুলো আছে, এগুলো দূর করতে হবে। তাহলে বিনিয়োগের সুযোগগুলো ওখানেও যাবে।’

শ্রমিকরা মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন, তাদের দক্ষতা যদি না বাড়ানো যায়, তাহলে ভালো আয়ের চাকরি পাবেন না। সেজন্য শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা–এগুলোতে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে মৌলিক শিক্ষার মান প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বাড়াতে হবে, নাহলে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ারই সুযোগ থাকে না। বেসরকারি বিনিয়োগ যেন বৈষম্য বাড়াতে না পারে, সেজন্য এগুলো করতে হবে বলেও মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এ লিড ইকোনমিস্ট।

তিনিও মনে করেন, ‘বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়লে কিছু আপেক্ষিক বৈষম্য বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সবার যদি আয় বাড়তে থাকে, তাহলে একজনের ২০ শতাংশ একজনের ১৫ শতাংশ হলেও সবাই ওপরের দিকে যাবে। সবার কমবেশি আয় বৃদ্ধি অন্তত নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে বৈষম্য বাড়লেও অত বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু একটা বড় জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির থাকলো বা কমে গেল, গুটি কয়েক মানুষের আয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেল, তখন সমস্যার সৃষ্টি হবে।’

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ‘দলীয় নেতাকর্মীদের ফিডিং’
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাতকে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের ফিডিং (সরকারি অর্থ দলীয় কর্মীদের দেয়া) করানো বলে মনে করেন জোনায়েদ সাকি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা খাতটা হচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদের ফিডিংয়ের ব্যবস্থা করা। দলের যে নিম্ন পর্যায়ের কর্মীদের ফিডিং করা। যেমন গ্রামে ৩ হাজার টাকার ভিজিএফ কার্ড দিলে ১৫০০ টাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে ১৫০০ টাকা নিতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দলের যে নেতাকর্মীরা আছেন, তারা যে সামাজিক সুরক্ষা খাতের ভাগভাটোয়ারার সঙ্গে যুক্ত–এটা মূলত সরকারি টাকা তাদের পকেটস্থ করার একটা প্রক্রিয়া। যেভাবে সামাজিক সুরক্ষা তৈরির দরকার ছিল, সেই জায়গাটা হচ্ছে না।’

‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ঢুকিয়ে দিয়ে তারা সামাজিক সুরক্ষার কথা বলছে। এটা একটা হাস্যকর। মাথাভারী জনপ্রশাসন যে বেশিরভাগ টাকা খেয়ে ফেলছে, সেটাকে একটু কম দেখানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে জনগণের পেনশনের অংশটাকে যুক্ত করেছে’, মন্তব্য করেন জোনায়েদ সাকি।